শীতের সকাল।চারপাশে কোয়াশা ঘেরা। চার বা পাঁচ হাত সামনের কিছুই তেমন দেখা যাচ্ছে না।কে বলবে সকাল সাড়ে আটটা বাজে! এই শীতে মহাসড়কের পাশে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছে একটি মেয়ে।বড় বড় ট্রাক যাচ্ছে আর গাছপালাকে বিরক্ত করছে।আর এতে করে ঝিনুকের মতো শিশির বিন্দু বৃষ্টির ন্যায় মেয়েটিকে ছুয়ে দিচ্ছে।মেয়েটি বারবার হাতের ঘড়িটা দেখছে।চোখে মুখে বিরক্তির রেখা টেনে বললো "ইসস!দেরি হয়ে যাচ্ছে"


দূর থেকে একটি সিএনজি দেখা যাচ্ছে।মেয়েটি একটা স্বস্থির শ্বাস ফেললো।হাত দিয়ে ইশারা করে গাড়ি থামিয়ে, গাড়িতে উঠলো গন্তব্য গোপালগঞ্জ শহর।১৩ কিলোমিটারের রাস্তা গাড়িতে করে যেতে ২৫/৩০ মিনিট লাগে।বার বার ঘড়ি দেখছে।প্রত্যেক ক্লাসে নতুন শিক্ষক। আজকে কেমন শিক্ষক আসবে কে জানে! ৯টায় ক্লাস যদি দেরি হয়ে যায়।স্যার যদি বকা দেয়। এতো এতো চিন্তায় মাথা ঘুরছে। মেয়েটি গাড়িচালককে তাড়া দিয়ে বললো "মামা! দয়া করে একটু তাড়াতাড়ি চলুন" 

গাড়িচালক উত্তরে বললো "যাইতাছি মা।দেখছোই তো কত্ত কুয়াশা! শুধু তাত্তারি গেলে কি হইবো? সাবধানেও তো চালাইতে হইবো!" 

মেয়েটি চুপ করে বসে আছে। বার বার হাতের ঘড়ি দেখছে।এখন ঘড়ি দেখাটাই ওর মূল কাজ হয়ে উঠেছে। 


গোপালগঞ্জ পৌছে,ভাড়া মিটিয়ে হন্তদন্ত হয়ে হাটতে লাগলো।ঘড়িতে ৯ টা বাজে।মেয়েটি মনে মনে ভাবলো "এখন হেটে গেলে ১৫ মিনিট লাগবে। এর চেয়ে ভালো রিক্সায় যাই"। যেমন ভাবনা তেমন কাজ।একটা রিক্সাচালক ডাক দিয়ে রিক্সায় চড়ে বসলো আর বললো   "মামা!বটতলা উন্মেষ কোচিং এর সামনে যাব" রিক্সাচালক আপন মনে চালাচ্ছে ৫/৭ মিনিটের মধ্যে পৌছে গেলো। ভাড়া মিটিয়ে এক প্রকার দৌড়ে সিড়ি ভেঙ্গে ৩ তলায় উঠলো।কোনোদিক না তাকিয়ে ভয়ে ভয়ে দরজা দিয়ে ক্লাস রুমে উকি দিলো।শিক্ষক এখনো আসে নি।

বুকে হাত দিয়ে হাপাতে হাপাতে বললো "যাক স্যার আসেনি" 

ক্লাসের একটি মেয়ে হাত উচু করে বললো "হায় হুরাইরা" 

মেয়েটি বললো "হ্যালো তাকিয়া" 

"এতো হাপাচ্ছো কেন? অসুস্থ?"

"না গো,ভাবছিলাম স্যার চলে আসছে হয়তো তাই এক প্রকার দৌড়ায় আসছি" বলেই হুরাইরা হেসে দিলো। 


ঘাড়ের ব্যাগটা বেঞ্চে রেখে ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে নোটিফিকেশন দেখতে লাগলো। "শুভ সকাল" একটা বার্তা এসেছে ফোনে,হুরাইরার মুখে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠেছে৷ হুরাইরা বার্তার উত্তরে লিখলো "শুভ সকাল,ক্লাসে আছি।ক্লাস শেষ করে ফোন দিবনি।" এরই মধ্যে হাতে জীববিজ্ঞান বই নিয়ে ক্লাসে স্যার হাজির। ফোন সাইলেন্ট করে ব্যাগে রেখে দিলো৷ সবাই স্যারকে দেখে এক প্রকার থ বনে গেলো। পাশ থেকে তৃপ্তি হুরাইরার কানের কাছে এসে বললো "এরকম স্যারের তো সিনেমায় থাকা উচিৎ, এখানে কি করে?একদম উপন্যাসের নায়কের মতো দেখতে"  

হুরাইরা স্যারের দিকে এক পলক তাকিয়ে তৃপ্তিকে মুচকি হেসে বললো  "এখানে না আসলে তো এরকম উপন্যাসের নায়ককে সামনাসামনি দেখতে পারতে না!"

"উফফ! আজকের পড়া হোক বা না হোক আড়াই ঘন্টা শুধু স্যারকেই দেখবো" 

দুজনেই মুখ চেপে হেসে দিলো৷ হাত দিয়ে মুখ চেপে হাসি থামিয়ে দ্রুত জীববিজ্ঞান বই বের করলো। 


স্যার বোর্ডে নিজের পরিচয় লিখছে,সবার নজর এবার বোর্ডে।লেখা শেষ করে ঘুরে দাড়িয়ে সবার দিকে চোখ বুলিয়ে, রাশভারী কন্ঠে বললো "হেয়ার ইজ মাই ইনফো" 

বোর্ডে লেখা "ইমরান হাসান সাদি,স্টুডেন্ট অব ডিএমসি" 

তৃপ্তি হালকা কাত হয়ে হুমাইরাকে আস্তে আস্তে বললো "ডিএমসিতে চান্স পেয়ে এনার সাথেই প্রেম করবো, মিলিয়ে নিও"

হুমাইরা তৃপ্তিকে হালকা ধাক্কা  দিয়ে বললো "আগে মন দিয়ে পড়ে চান্স পাও তারপর যত ইচ্ছা প্রেম করো" 

সাদি স্যার বললো "চলো তাহলে পড়া শুরু করি"

লেকচার দেওয়া শুরু করলো।স্যার পড়াচ্ছে তো পড়াচ্ছে হঠাৎ হুমাইরার ব্যাগ কেপে উঠলো।বুঝতে পারলো বার্তা এসেছে।ব্যাগের ভেতর উকি দিয়ে ফোন স্ক্রিনের বার্তা দেখলো। অপাশ থেকে উত্তর এসেছে "আচ্ছা" 

হুমাইরা মনে মনে বললো "এতক্ষণে ম্যাসেজ দেখলো! হয়তো ব্যস্ত ছিলো"। ভাবনা থেকে বের হয়ে আবার পড়ায় মন দিলো। স্যার পড়াচ্ছে ঠিকই কিন্তু কারোর দিকে তেমন তাকাচ্ছে না। পড়ার ফাঁকে স্যার বললো "সব বিষয় সমান গুরুত্ব দিতে হবে।তোমরা কি শুধু জীববিজ্ঞান নিয়েই পরে থাকো? আচ্ছা বলো তো সেন্ট মার্টিনের আয়তন কত?" 

হুমাইরা উত্তরের অপেক্ষায় বসে আছে কেউ কিছু বলছে না তাই নিজেই বললো "স্যার ৮ কিলোমিটার"

সাদি বইয়ে চোখ রেখেই বললো "হুম হয়েছে,আচ্ছা এবার বলো তো!বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় চা বাগান কোথায়?"

হুমাইরা পুনরায় উত্তর দিলো "মৌলোভিবাজার, ৯০ টি বাগান" 

সবাই হুমাইরার দিকে গোল গোল করে তাকিয়ে আছে,যেন সে বিশ্ব জয় করে ফেলেছে।

সাদি এবারো বইয়ে চোখ রেখেই বললো "হুম হয়েছে,চলো আবার পড়ায় ফিরে যাই" 


এক ঘন্টা,দুই ঘন্টা এমন করে টানা আড়াই ঘন্টা  ক্লাস হলো সাদি বইটা হাতে নিয়ে চলে যায়।সবাই স্বস্তির নিশ্বাস নিয়ে নড়ে চড়ে বসছে।হুমাইরার মাথা ঘুরছে,এখন আবার পরীক্ষা।মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে।তৃপ্তি প্রায় চেচিয়ে বললো "আমাদের এখনো জিকে ক্লাস হয় নাই,তুমি এতোকিছু পারো কিভাবে?"

"অবসর সময়ে পড়ি" হুমাইরা মুচকি হেসে বললো।

পরীক্ষার খাতা, প্রশ্ন নিয়ে একজন ক্লাসে প্রবেশ করলো।হুমাইরার বিরক্তে কপাল কুচকে গেলো। মনে মনে বললো "কবে যে মুক্তি পাবো!" 


দেড়টা বাজে। হুমাইরা খুশি মনে কোচিং থেকে বের হয়ে রাস্তা দিয়ে হাটছে। হাতে ফোন,উদ্দেশ্য সকালে একজনকে কথা দিয়েছে ক্লাস শেষে ফোন দিবে।নাম্বারে ডায়াল করলো দুবার রিং হওয়ার পর অপর পাশ থেকে কেটে দিলো।এক মিনিট পার হতে না হতেই হুমাইরার ফোন বেজে উঠলো।স্ক্রিনে লেখা "উনি"।ঠোটে মিষ্টি হাসি টেনে রিসিভ করে বললো " কেমন আছেন?" 

অপর পাশ থেকে বললো,,,,,,,


চলবে,,,,,,