মা তিনদিন খাবার দেয়নি মেয়েটিকে। পেটে পাথর বেঁধে সহ্য করছে সে। ক্ষুধার যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে রাতের আঁধারে বালিশ কামড়ে ধরেছে।
গভীর রাত, দরজার ওপাশে খটখট শব্দ শুনে ইভা বিছানা ছেড়ে উঠে। চোখ মুছতে মুছতে দরজার সামনে এসে দাঁড়াতেই ছোট্ট শব্দে ওপাশ থেকে বলল, ‘মা দরজাটা খোল’।
ইভা বুঝতে পারে এটা তার বাবা। দরজা খুলে। অন্ধকার রুম, ইভা মিলিয়ে আছে সে অন্ধকারে। বাবা নিজের হাত বাড়িতে তার হাতে একটা খাবারের প্যাকেট দিয়ে বলে,
‘এতে রুটি আছে তোর শরীরের ওজন একটু কমবে, এত না খেয়ে থাকলে শরীর খারাপ করবে যে।’
ইভার চোখ বেয়ে তখন অশ্রু ঝড়ছে। বাবা তা দেখতে পারছে না। নিজের শরীরের রং যে অন্ধকারে মিলিয়ে আছে। চিৎকার করে বলতে মন চাইছে তার ‘বাবা আমি না খেয়ে নেই আমাকে খাবার দেওয়াই হয়না।’
বাবা শুনলো না তার কথা। পিছন ফিরে অন্ধকারে মিলিয়ে গেলো। ইভা নিজের রুমের দরজা বন্ধ করে শুকনো রুটিতে কামড় দিচ্ছে। চোখের নোনতা জলে ভিজছে রুটি।
সকাল হচ্ছে, পূর্ব আকাশ থেকে আজানের ধ্বনি বাজছে। সে শুয়ে থাকতে পারল না। বিছানা ছেড়ে উঠে ওজু করে সিজদাহ্য় ডুব দিয়েছে। জায়নামাজের উপর দুহাত তুলে কিছু চাইছে সে। মুক্তি নয়তো প্রাপ্তি।
আস্তে আস্তে সূর্য উঠলো। সমাজ জাগ্রত হচ্ছে, বিবেক এখনও ঘুমন্ত।
চেঁচাতে চেঁচাতে মা আসলো দরজার সামনে,
‘ইরে নবাবজাদি আর কত ঘুমাবি, সকাল হয়েছে ঘরের কাজ করবে কে শুনি?’
জায়নামাজে সে তখনও। উঠে দরজা খুলতেই মা তার সামনে ওজন মাপার একটা মেশিন রাখল।
কর্কশ গলায় বলল,
‘আমারে গিলতে গিলতে নিজেই ড্রাম হয়েছিস, দেখ কত কেজি কমলো।’
ইভা মায়ের কথায় কিছু মনে করল না। নিজের শরীর একটু বেশি। মেশিনে দেখালো ৯২ কেজি। তা দেখে মায়ের চোখ কপালে। পারছে না তার শরীরে হাত দিতে। মেশিনের উপর রাগ দেখিয়ে হনহনিয়ে সেখান থেকে চলে গেলো।
ইভার মন খারাপ হয়না এখন। শরীরে রঙ কিংবা ওজন দুটোই আপনাআপনি হয়েছে। বেটো হয়েছে নিজের ডিএনএ'র সমস্যায়।
এ সমাজে নারীর মূল্যায়ন সাদা চামড়ায় হয়। নারী প্রতিবন্ধী হোক তবুও ফর্সা হতে হবে। বেটো হোক মোটা হোক তবুও ফর্সা হতে হবে। নতুবা সমাজ তাকে জীবিত অবস্থায় মৃত বানিয়ে দিবে। ইভা তেমনই এক চরিত্র এ সমাজের। মৃত!
সকালের কাজ শেষ করে, হাতমোজা পায়ে মোজা বোরকা পরে প্রাইমারী স্কুলের উদ্দেশ্যে রওনা হয় সে। সেখানের বাংলা শিক্ষিকা ইভা। বাবা-মা সমাজ'ই তাকে নিয়ন্ত্রণ করে। একটি মেয়ে উঁচু গলায় জোর দেখিয়ে কথাও বলতে পারে না, গ্রাম্য সমাজে। তারা বন্দী অদৃশ্য দেয়ালে।
রাস্তা দিয়ে হাঁটছে ইভা। ভার্সিটির এক ব্যাচমেটের সাথে দেখা। তারা পূর্বপরিচিত হলেও কথা হতো না তাদের। সিয়াম এলাকার মাস্তান, তবে সে এখনও পড়ালেখা করছে। ইভা অনার্সে থাকাকালীন চাকরিটা পেয়ে গেছে তাই সে চাকরি করছে। সিয়াম নিজের দেহ ভঙ্গি পাল্টে হাসি মুখে বলল,
‘কেমন আছো ইভা?’
‘আলহামদুলিল্লাহ, ভাইয়া আপনি কেমন আছেন?’
‘এইত যাচ্ছে।’
ইভা চুপ হয়ে তার পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে। সিয়াম পথ আটকে বলল,
‘দাঁড়াও একটু কথা আছে।’
‘জ্বি বলুন ভাইয়া।’
‘সোজাসুজি বলি কথাটা?’
‘বলেন।’
‘আমি তোমার সাথে সেক্স করতে চাই।’
হঠাৎ বাজ পড়লো তার উপর। সময় থমকে গেছে ইভার। মুখের দিকে তাকানোর সাহস হয়নি তার। সিয়ামের কথাটা শুনতে যতটা বিশ্রী লাগছে, তারচেয়ে ভয়ানক তার চেহারা হয়ে উঠেছে। ঘৃণায় দম বন্ধ হয়ে আসছে ইভার। বাকরুদ্ধ সে, সেখান থেকে দ্রুত পালিয়ে যাচ্ছিল। পিছন থেকে সিয়াম বলল,
‘আমি তোমার পিছু ছাড়ব না ইভা। দেখতে হবে না তোমার রঙ, আমার শুধু শারীরিক সুখ হলেই হবে।’
ইভা কেঁদে দেয়। পালাতে পালাতে স্কুল পর্যন্ত এসেছে। চোখের জ্বলে নেকাব ভিজেছে। টিস্যু দিয়ে মুছে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করেও হয়নি তাতে। ক্লাস নিতে পারেনি একটাও। মানসিক যন্ত্রণা এত গাঢ় হচ্ছে, যেন বারবার সিয়ামের ঘৃণা জড়ানো কণ্ঠ কানে বাজছে। এই বুঝি সিয়াম তার শরীর ছুঁইল।
শারীরিক গঠন রঙ একটি মেয়ের এতটা গুরুত্ব দেয় সমাজ, তা ইভা এখন বেশ বুঝতে পেরেছে। বইয়ের পাতায় বর্ণহীন মানুষের সমাজ গড়ে তোলার কথা থাকলেও বাস্তবতা ভিন্ন। বেশ কঠিন।
পেটে ক্ষুধা লেগেছে। স্কুলের সামনের দোকানটাতে এসে বলল,
‘চাচা দুটো কলা আর রুটি দিন’
‘ম্যাডাম আপনার মায়ের কড়া নিষেধ আছে, আপনার কাছে কিছু বিক্রি করা যাইব না।’
‘আমার কাছে বিক্রি করা যাইব না মনে?’
‘তা তো জানি না ম্যাডাম। তয় আপনার যা শরীর.....’
দোকানদার কিছু বলার আগেই ইভা বলল,
‘কোথাও এটা লেখা থাকলে ভালো হতো, কিছু মূর্খরা কখনও মানুষ হতে পারে না। আবার কিছু শিক্ষিত লোক অমানুষ হয়ে যায়’
‘ম্যাডাম রাগ কইরেন না।’
‘চাচা আপনার একটা মেয়ে আছে।’
‘ সে থাকুক, তার চেহারা সুরত মেলা সুন্দর।’
ইভা অপমান হচ্ছে। দাঁড়িয়ে থাকল না সেখানে। স্কুলের বারান্দায় এসে দাঁড়াতেই ৬ বছরের এক শিশু এক টিফিন বক্স এনে তার হাতে দিয়ে বলল,
‘ম্যাম আমার আম্মু এটা আপনাকে দিতে বলছে’
ইভা তাকিয়ে দেখলো ‘স্বর্ণা’ তার কলেজ লাইফের বান্ধবীর মেয়ে। টিফিন বক্স হাতে নিয়ে ঢাকনা খুলে দেখল ভাত মাছ। তার চোখ ছলছল করে উঠল। সে স্বর্ণার মাথায় হাত দিয়ে বলল ‘তুমি তোমার মায়ের মতই ভালো লক্ষীটি’
‘ম্যাম আম্মু বলছে, আপনাকে কাঁদতে বারন করছে’
‘তোমার আম্মু ও খুব ভালো’
‘ও ম্যাম আম্মু আপনাকে আমাদের বাসায় যেতে বলছে।’
‘যাব সোনা একসময় করে’
স্বর্ণা সেখান থেকে ক্লাসরুমে গেলো।
ইভা শিক্ষকদের আলাদা রুমে এসে খাওয়া সেরে নেয়।
স্কুল ছুটি। বাসায় ফিরছে সে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে সিয়াম। ইভার শরীর কাঁপছে। চারদিকে যেসব ঘটনা ঘটছে সেব ঘটনাও তার জানা। মাথা নিচু করে হেটে যাচ্ছিল সে, সিয়াম ডাক দিলো।
‘এই ইভা’
ধুকপুক করছে তার হৃদপিণ্ড। দ্রুত করে পা ফেলছে ছুটে যাবার জন্য। সিয়াম পিছু নিয়ে বলল, ‘তোমাকে যা বলছি তা মনে আছে?’
‘দেখুন ভাইয়া এসব খারাপ প্রস্তাব অন্তত আমাকে করবেন না প্লিজ’
‘এটা খারাপের কি হলো? শারীরিক চাহিদা থাকতেই পারে সবার।’
‘ভাইয়া এটার জন্য বিয়ে করে ফেলুন।’
‘বিয়ে? আর তোকে? ছিঃ ’
‘আমাকে বিয়ে করতে বলিনি ভাইয়া। অন্য কাউকে বিয়ে করে এসব চাহিদা মেটানোই ভালো’
‘তা তো করবোই। কিন্তু তোর সাথেও..’
সিয়াম কথাটা শেষ করার আগেই রাস্তার মোড় ঘুরে যায়। ইভা দ্রুত সেখান থেকে চলে আসে।
সিয়াম অনেকটা দূরে। একটু আড়ালে আসতেই বুকে হাত দিয়ে বসে পড়ে সে। হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করে।
গ্রামের এক মুরব্বি যাচ্ছিল সে পথ দিয়ে। সাথে তার নাতনি। ইভাকে কাঁদতে দেখে সে দাঁড়ালো ‘ম্যাডাম ম্যাডাম’ বলে।
ইভা চোখ মুছে দাঁড়ায়। মুরব্বি ইভাকে চিনে, তার নাতনিও চিনে।
মুরব্বি বলল,
‘ইভা তোমার কি হইছে? কাঁদতেছো কেন?’
‘চাচা আমি খুব অসহায় তাই কাঁদছি। ’
‘আমি জানি মা’
‘কি করব আমি চাচা?’
‘ধৈর্য ধর মা। তিনি সকলের পরীক্ষা নেন।’
‘আর কত পরীক্ষা দিলে এর শেষ হবে?’
‘তা তো জানি না মা। তবে আশাকরি খুব তাড়াতাড়ি তেমার মুক্তি মিলবে।’
‘তা যেন হয় চাচা’
চাচা কিছু অনুভব করল চারপাশে। কেউ তাকে অদৃশ্য ভাবে অনুসরণ করছে।
ইভার দিকে লক্ষ করে বলল।
‘মা এটা এলাকার নিষিদ্ধ জায়গা, এখানে তোমার এমনভাবে কাঁদা ঠিক হয়নি। দ্রুত বাসায় যাও।’
‘কেন চাচা কি আছে এখানে?’
‘তুমি বুঝবা না মা। বেশ পুরানো কথা। ’
‘বলেন শুনি চাচা।’
‘এখানে এসব বলা ঠিক হবে না মা। তুমি বাসায় যাও। সময় করে একদিন তোমার বাসায় এসে সবকিছু বলব।’
‘আচ্ছা চাচা।’
ইভা সামনের দিকে পা বাড়ায়। পিচ্চি মেয়েটার ব্যাগ থেকে বকুল ফুলের একটা মালা বের করে বলল,
‘ম্যাডাম এটা আপনার জন্য।’
ইভা মুচকি হেসে মালাটি নিয়ে পিচ্চিটার গাল টেনে বলল,
‘থ্যাংকিউ আমার সোনাটা’
ইভা প্রস্থান করে সেখান থেকে, চাচা দাঁড়িয়ে আছে। চারদিক খেয়াল করছে। কিছু একটা গন্ধ ভেসে আসছে। বিরবির করে বলতে লাগল চাচা ‘কিছু অনর্থ ঘটতে চলেছে নিশ্চয়ই।’
চলবে....

0 Comments